আধ্যাত্মিক চিকিৎসা বা তদ্বির জগতের এক অতি পরিচিত মাধ্যম হলো তাবিজ। যুগ যুগ ধরে মানুষ রোগ-বালাই, মানসিক শান্তি এবং বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে পবিত্র আয়াত ও দোয়া সম্বলিত তাবিজ ব্যবহার করে আসছে। তবে তাবিজ বা কবচ ব্যবহারের সুফল পেতে হলে এর নেপথ্যের নিয়ম-কানুন (Rules) এবং আদব (Etiquettes) সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। ভুল পদ্ধতিতে বা অপবিত্র অবস্থায় তদ্বির করলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আজকের
এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা প্রাচীন বুজুর্গদের
অভিজ্ঞতালব্ধ তাবিজ লেখার সঠিক পদ্ধতি, বিশেষ
কিছু কৌশল এবং এর
জায়েজ-নাজায়েজ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
১.
তাবিজ লেখার পূর্বপ্রস্তুতি ও পবিত্রতা
যেকোনো
আধ্যাত্মিক কাজের মূল ভিত্তি হলো
পবিত্রতা। তাবিজ লেখার পূর্বে লেখককে অবশ্যই বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণভাবে পবিত্র
হতে হবে।
- ওজু
ও গোসল: তাবিজ লেখার আগে সুন্দরভাবে ওজু করে নেওয়া আবশ্যক। যদি শরীরে জানাবাত বা অপবিত্রতা থাকে, তবে অবশ্যই গোসল করে পাক-সাফ হতে হবে।
- সুগন্ধির
ব্যবহার:
আরবী তাবিজ বা পবিত্র দোয়া লেখার সময় শরীরে উত্তম সুগন্ধি (আতর) ব্যবহার করা সুন্নত ও বরকতময়। এছাড়া তাবিজ লেখার স্থানেও ধূপ বা আগরবাতি জ্বালিয়ে সুগন্ধিময় পরিবেশ তৈরি করা উচিত। এটি মনকে একাগ্র করতে সাহায্য করে।
- নির্জনতা
ও মৌনতা: তাবিজ লেখার সময় কারো সাথে কথা বলা উচিত নয়। কথাবার্তা বললে মনোযোগ বিঘ্নিত হয়, যা তদ্বিরের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া খেয়াল রাখতে হবে যেন আশেপাশে কোনো নাপাক বস্তু বা প্রাণীর ছবি না থাকে।
২.
ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে তাবিজ লেখার বিশেষ কৌশল
তদ্বির
শাস্ত্রে উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে
তাবিজ লেখার ধরনে ভিন্নতা আনা
হয়। এটি মূলত একটি
মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার
সমন্বয়।
ক)
প্রেম-প্রীতি ও বশীকরণের তদ্বির
যদি
কোনো বৈধ উদ্দেশ্যে (যেমন
স্বামী-স্ত্রীর মিল বা বিবাদ
মেটানো) মহব্বতের তাবিজ লেখা হয়, তবে
লেখককে মুখে মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য (যেমন চিনি বা
মিছরি) রেখে লিখতে হয়।
এতে তদ্বিরের মধ্যে এক ধরণের ইতিবাচক
আকর্ষণ তৈরি হয় বলে
মনে করা হয়। তবে
মনে রাখতে হবে, কোনো প্রকার
অবৈধ বা হারাম সম্পর্কের
জন্য এসব তদ্বির করা
গুনাহের কাজ।
খ)
শত্রুর অনিষ্ট থেকে বাঁচার তদ্বির
শত্রুর
কুদৃষ্টি বা ক্ষতি থেকে
বাঁচার জন্য তদ্বির করার
সময় নির্জনতা অবলম্বন করা শ্রেয়। লেখার
সময় শত্রুর চেহারা কল্পনা করা বা তার
নাম স্মরণ করে একাগ্রতার সাথে
লিখতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে
বুজুর্গগণ ধূপ বা মোম
জ্বালিয়ে অন্ধকার ঘরে বসে একাগ্র
মনে লেখার পরামর্শ দেন, যাতে বাইরের
কোনো শব্দ বা চিন্তা
কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে।
৩.
রং ও কালির আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান
প্রাচীন
বুজুর্গদের মতে, যার জন্য
তাবিজ লেখা হচ্ছে, তার
দেহের বর্ণ বা গায়ের
রঙের সাথে মিল রেখে
কালি ব্যবহার করলে ফলাফল দ্রুত
পাওয়া যায়। এটি একটি
সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান:
|
ব্যক্তির গায়ের রং |
ব্যবহৃত কালির ধরন |
|
লাল বর্ণ |
লাল
রঙের কালি |
|
হলুদ বর্ণ |
জাফরান
(Zaffron) কালি |
|
সাদা বর্ণ |
কপুর
বা চুন মিশ্রিত সাদা কালি |
|
কালো বর্ণ |
সাধারণ
কালো কালি |
এই
রঙের সমন্বয় মূলত মানুষের মেজাজ
এবং প্রকৃতির (যেমন: রক্তাভ বা পিত্ত প্রকৃতি)
সাথে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা
হয়।
৪.
তাবিজ ব্যবহারের আদব ও টয়লেটে প্রবেশের বিধান
অনেকের
মনেই প্রশ্ন জাগে, তাবিজ গায়ে থাকলে টয়লেটে
বা অপবিত্র স্থানে যাওয়া যাবে কি না।
এ বিষয়ে বিধান হলো:
- আবরণ
থাকা: তাবিজ যদি রুপা বা তামার মাদুলিতে (Case) ভরা থাকে এবং উপরে কাপড়ের আবরণ থাকে, তবে তা নিয়ে প্রস্রাব-পায়খানায় যাওয়া জায়েজ। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো আল্লাহর নাম বা পবিত্র আয়াত যেন সরাসরি খোলা অবস্থায় না থাকে।
- সতর্কতা:
যদি তাবিজটি শুধু কাগজে লেখা হয় এবং কোনো মজবুত আবরণ না থাকে, তবে তা খুলে রাখাই সর্বোত্তম আদব। অপবিত্র অবস্থায় পবিত্র কালামের অবমাননা করা গুনাহের কাজ।
৫.
তাবিজ ও ঝাড়-ফুঁকের বিনিময় মূল্য গ্রহণ
তাবিজ
লিখে বা ঝাড়-ফুঁক
দিয়ে টাকা নেওয়া কি
জায়েজ? এটি একটি অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিধান:
ইসলামি শরীয়তের আলোকে যদি তদ্বিরকারী সৎ
হন এবং তার মধ্যে
কোনো ধোঁকাবাজি না থাকে, তবে
তিনি তার সময় ও
শ্রমের বিনিময় হিসেবে হাদিয়া বা পারিশ্রমিক গ্রহণ
করতে পারেন। তবে যারা অভিজ্ঞ
নয়, কেবল কিতাব দেখে
অর্থ উপার্জনের নেশায় সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়, তাদের জন্য
এই অর্থ গ্রহণ করা
সম্পূর্ণ হারাম।
"যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা এবং মানুষকে ভুল বুঝিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া কবিরা গুনাহ।"
৬.
সতর্কতা: কোনটি জায়েজ আর কোনটি শিরক?
তাবিজ
ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সতর্কতা হলো
ঈমান রক্ষা করা।
- আল্লাহর
নাম ও কালাম: যে তাবিজে আল্লাহর নাম, গুণবাচক নাম বা কোরআনের আয়াত নেই, বরং অবোধ্য কোনো নকশা বা কুফরী কালাম রয়েছে, তা ব্যবহার করা শিরক ও হারাম।
- যাদু-টোনা: যাদু বা সেহের শিক্ষা করা এবং এর মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করা কুফরী কাজ। এতে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়।
- আকীদাহ
বা বিশ্বাস: মনে রাখতে হবে, তাবিজ নিজে কোনো ক্ষমতার অধিকারী নয়। সকল রোগ মুক্তি এবং বিপদ দূর করার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাবিজ কেবল একটি ওসীলা বা মাধ্যম মাত্র।
৭.
সঠিক তদ্বিরকারীর গুণাবলি
যিনি
তাবিজ লিখবেন, তাকে অবশ্যই একজন
মুত্তাকী বা পরহেজগার ব্যক্তি
হতে হবে। তার মধ্যে
নিম্নলিখিত গুণগুলো থাকা কাম্য:
- তিনি
নিয়মিত নামাজ আদায়কারী হবেন।
- তদ্বির
করার সময় মনে মনে তার পীর বা কোনো পবিত্র ব্যক্তির (বুজুর্গ) চিন্তা করবেন এবং ভাববেন যে তিনি সামনে দাঁড়িয়ে আছেন (যাকে আধ্যাত্মিক পরিভাষায় 'রাবেতা' বলা হয়)।
- তার
মন-প্রাণ হবে হিংসা ও লোভমুক্ত।
উপসংহার
তাবিজ
বা তদ্বির ইসলামের একটি আধ্যাত্মিক চিকিৎসার
অংশ হতে পারে যদি
তা সঠিক পদ্ধতিতে এবং
বিশুদ্ধ আকীদাহ নিয়ে করা হয়।
আমাদের সমাজে অনেক ভণ্ড তান্ত্রিক
বা ধোঁকাবাজ তাবিজে কুফরী কালাম ব্যবহার করে মানুষের ঈমান
নষ্ট করছে। তাই যেকোনো তদ্বির
গ্রহণের আগে নিশ্চিত হওয়া
প্রয়োজন যে তাতে কেবল
আল্লাহর কালাম ও দোয়া রয়েছে।
পবিত্রতা
বজায় রেখে, নিয়ত শুদ্ধ করে
এবং একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে
যদি তদ্বির করা হয়, তবে
ইনশাআল্লাহ তার সুফল পাওয়া
যাবে। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে
সকল প্রকার কুফরী ও শিরক থেকে
রক্ষা করুন এবং সঠিক
পথে চলার তৌফিক দান
করুন। আমীন।

0 Comments